ছাগল পালন পদ্ধতি : জেনেনিন‌ কিভাবে করবেন ছাগল পালন

আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা ছাগল পালন পদ্ধতি বা কিভাব আধুনিক পদ্ধতিতে ছাগল পালন করা যায় এসব বিষয়ে জেনে নিতে চলেছি।

ছাগল পালন পদ্ধতি

ছাগল পালন পদ্ধতি : আধুনিক পদ্ধতিতে ছাগল পালন

আপনি যদি বাড়িতে বসে ব্যবসা করতে চাইছেন তাহলে ছাগল পালন আপনার জন্য খুবই ভালো এবং লাভজনক একটি ব্যবসা হয়ে দাড়াতে পারে।

কেননা ছাগল খুবই শান্ত প্রকৃতির একটি পশু। এরা সবসময় শান্ত মনভাবের হয়ে থাকে।

তাই আপনি যদি বাড়িতে বসে লাভজনক কোন একটি ব্যবসা আইডিয়ার খোজে রয়েছেন তাহলে ছাগল পালন এর বিষয়ে অবশ্যই আপনার জেনে নেওয়া দরকার।

এমনিতে বসে বসে করার মতো অনেক ছোট খাটো ব্যবসা গুলো রয়েছে যেগুলো করতে তেমন কোন শ্রম বা অর্থের খরচ করতে হয় না এবং প্রচুর লাভবান হওয়া যায়।

ছাগল পালন কেন করবেন ?

বেশিরভাগ সময়ে দেখা যায় যে গ্রামের বাড়িগুলোতে প্রায় প্রত্যেকটি বাড়িতেই ছাগল পালন করতে দেখা যায়।

কৃষকরা ছাগল, গরু, হাস, মুরগি এগুলো পালন করতে প্রচুর পছন্দ করে থাকেন। কেননা এগলো তাদের একটা বাড়তি আয় দিয়ে থাকে।

গৃহপালিত যে সকল পশু রয়েছে এগুলো আমাদের মূল্যবান সম্পদ। এগুলোর মাংস একদিকে খুবই সুস্বাদু যার কারণে বাজারে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তাছাড়া একটি বড় পরিসরে ছালল পালন করতে এখান থেকে খুবই লাভবান হওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি।

আশা করি ছাগল পালনের লাভজনক দিকগুলোর বিষয়ে জানতে পেরেছেন।

ছাগল পালন পদ্ধতি

আসলে আমাদের দেশে ছাগল পালনের জন্য তেমন কোন পদ্ধতির ব্যবহার করা হয় না।

গ্রামে সাধারণত কৃষকরা খোলামেলা ভাবেই ছাগল পালন করে থাকেন। ছাগলকে মাঠে ছেড়ে দিলেই ঘাস খেতে থাকে।

আর গ্রামে কৃষকরা ছাগল পালন করার জন্য বলতে গেলে কোন টাকাই খরচ করেন না।

শুধুমাত্র এগুলোর দেখাশোনা করলেই হয়।

কিন্তু এই পদ্ধতিতে মাত্র কয়েকটি বা খুবই কম সংখ্যক ছাগল পালন করা সম্ভব।

আর এই পদ্ধতিতে সাধারণত গ্রামের মানুষরাই একটি দুটি করে ছাগল পুশে থাকেন।

কিন্তু এর বিপরীতে আপনি যদি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে ছাগল পালন করতে চাইছেন এবং এখান থেকে ভালো লাভবান হতে চাইছেন তাহলে আপনাকে কিছু বিষয়ে অবশ্যই ধারণা নিতে হবে বা অভিজ্ঞতা রাখতে হবে।

কেননা ব্যবসার উদ্দেশ্য ছাগল পালন করতে হলে আপনাকে একটু বড় পরিসরে বা সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ আগে থেকেই করতে হবে।

আপনাকে ছাগলের ভালো মন্দ সকল বুষয়ে আগে জেনে নিতে হবে।

কারণ ছাগলের খাবার তালিকা এবং রোগ বালাই দমনের মতো কিছু বিষয় সম্পর্কে আপনাকে জেনে নিতে হবে।

তাছাড়া যদি আপনি ছাগলের খামার করতে চাইছেন তাহলে আপনাকে ছাগলের খামার করতে কত টাকা লাগবে এ বিষয়ে জানতে হবে।

তো চলুন নিচে এসব বিষয়ে জেনে নেওয়া যাক।

ছাগল পালনের পদ্ধতি কয়টি ?

দেখুন ছাগল পালনের সাধারণত দুইটি পদ্ধতি রয়েছে। যদিও এই পদ্ধতি গুলোর বিষয়ে আমি আপনাদের উপরে ধারণা দিয়ে দিয়েছি। তবুও নিচে এ বিষয়ে আরো ভালোভাবে জানতে পারবেন।

আপনি ব্যবসায়িক ভাবে কিংবা নিজের প্রয়োজনে অল্প পরিসরে যেভাবেই ছাগল পালন করতে চান না কেন, আমার সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন কারণ এটি আপনাকে অনেক কাজে দিবে।

আধুনিক পদ্ধতিতে ছাগল পালন করে সাবলম্বী হোন

বাংলাদেশে ছাগল অন্যতম গৃহপালিত পশু। ছাগী ৭-৮ মাসের মধ্যে বাচ্চা ধারণ করার ক্ষমতা অর্জন করে।

এরা একসাথে ২-৩ টি বাচ্চা দেওয়ার কারণে কৃষকের নিকট খুব জনপ্রিয়।

একটি ছাগল খাসি ১২-১৫ মাসের মধ্যে ১৫-২০ কেজি হয়ে থাকে।

ছাগলের মাংস খুব সুস্বাদু। তাই বাজারে এ ছাগলের অনেক চাহিদা রয়েছে।

প্রচলিত পদ্ধতিতে ছাগল পালন: গ্রামে ছাগলকে মাঠে, বাগানে, রাস্তার পাশে বেধে বা ছেড়ে দিয়ে পালন করা হয়।

সাধারণত ছাগলকে বাড়ি থেকে কোনাে বাড়তি খাদ্য সরবরাহ করা হয় না। কৃষক বর্ষাকালে বিভিন্ন গাছের পাতা কেটে ছাগলকে খেতে দেয়।

রাতে ছাগলকে নিজেদের থাকার ঘর বা অন্য কোনাে ঘরে আশ্রয় দেয়।

বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ছাগল পালনের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এতে ছাগলের বাসস্থান, খাদ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৈজ্ঞানিক উপায়ে আবদ্ধ ও অর্ধ-আবদ্ধ পদ্ধতিতে ছাগল পালন করা হয়।

যাদের চারণ ভূমি বা বাধার জন্য কোনাে জমি নেই সেখানে আবদ্ধ পদ্ধতিতে ছাগল পালন করা হয়।

আবদ্ধ পদ্ধতিতে ছাগল পালন

এখানে সম্পূর্ণ আবদ্ধ অবস্থায় ছাগল পালন করা হয়।

ছাগলের ঘরের জন্য উঁচু ও শুকনা জায়গা নির্বাচন করতে হয়।

এ পদ্ধতিতে ঘর তৈরি করার জন্য কাঠ, বাশ , টিন, ছন, গােলপাতা ব্যবহার করে কম খরচে ঘর তৈরি করা যায়।

ঘর তৈরি করার সময় প্রতিটি বয়ক ছাগলের জন্য ১ বর্গমিটার (১০ বর্গফুট) জায়গার প্রয়ােজন হবে।

মেঝে সেঁতসেঁতে হলে ছাগলের ঘরে মাচা তৈরি করে দিতে হবে । এখানে ছাগলকে সম্পূর্ণ আবদ্ধ অবস্থায় প্রয়ােজনীয় সবুজ ঘাস, দানাদার খাদ্য ও পানি সরবরাহ করা হয়।

তবে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য ঘরের বাইরে ঘুরিয়ে নিয়ে এলে এদের স্বাস্থ্য ভালাে থাকে। নতুন ছাগল দিয়ে খামার শুরু করলে প্রথমেই সম্পূর্ণ আবদ্ধ অবস্থায় রাখা যাবে না।

আস্তে আতে এদের চারণ সময় কমিয়ে আনতে হবে। নতুন পরিবেশের সাথে অভ্যস্ত হলে খাদ্য গ্রহণে আর সমস্যা দেখা দিবে না।

অর্ধ আবদ্ধ পদ্ধতিতে ছাগল পালন

এ পদ্ধতিতে ছাগল পালনের সময় অর্ধেক আবদ্ধ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

খামারে আবদ্ধ অবস্থায় এদের জানার খাদ্য সরবরাহ করা হয়।

মাঠে চারণের মাধ্যমে এরা সবুজ ঘাস খেয়ে থাকে। বর্ষার সময় মাঠে নেওয়া সম্ভব না হলে সবুজ ঘাসও আবদ্ধ অবস্থায় সরবরাহ করতে হবে।

ছাগলের খাদ্য ব্যবস্থাপনা

ছাগলের খাদ্য ব্যবস্থাপনাই হচ্ছে অন্যতম প্রধান বিষয়।

ছাগল সবুজ ঘাস ও দানাদার খাদ্য খেয়ে জীবন ধারণ করে।

তাছাড়া চিকন ধানের খড় খুব ছােট করে কেটে চিটাগুড় মিশিয়েও ছাগলকে খাওয়ানাে যায়। খাদ্য ব্যবস্থাপনার প্রথমেই ছাগল ছানার কথা ভাবতে হবে।

ছাগল ছানা ২-৩ মাসের মধ্যে মায়ের দুধ ছাড়ে।

বাচ্চার বয়স ১ মাস পার হলে উন্নত মানের কচি সবুজ ঘাস ও দানাদার খাদ্যের অভ্যাস করাতে হবে।

সবুজ ঘাস: ছাগলের জন্য ইপিল ইপিল, কঁঠাল পাতা, খেসারি, মাষকলাই, দূর্বা, বাকসা ইত্যাদি ঘাস বেশ পুষ্টিকর।

দেশি ঘাসের প্রাপ্যতা কম হলে ছাগলের জন্য উন্নত জাতের নেপিয়ার, পারা, জার্মান ঘাস চাষ করা যায়।

চাষ করা ঘাস কেটে বা চরিয়ে ছাগলকে খাওয়ানাে যায়।

ছাগলের জন্য তৈরি দানাদার খাদ্য দানাদার খাদ্য: ছাগলের পুষ্টি চাহিদা মিটানাের জন্য সবুজ ঘাসের সাথে দৈনিক চাহিদামতাে দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। গম, ভুট্টা, গমের ভুসি, চালের কুঁড়া, বিভিন্ন ডালের খােসা, খৈল, শুটকি মাছের গুঁড়া ইত্যাদি দানাদার খাদ্যের মিশ্রণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

দানাদার খাদ্যের সাথে খাদ্য লবণ ও ভিটামিন খনিজ মিশ্রণ যােগ করতে হয়। বয়সভেদে ছাগলকে দৈনিক ১-২ লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হয়।

এদের ঘরের দেয়ালে প্রয়ােজনে চটের বস্তা টেনে দিতে হবে।

নিচে ছাগলের রােগের কারণসমূহ উল্লেখ করা হলাে।

  • ভাইরাসজনিত রােগ: পি.পি.আর, নিউমােনিয়া ইত্যাদি।
  • বাকটেরিয়াজনিত রােগ: গলাফুলা, ডায়রিয়া ইত্যাদি।
  • পরজীবীজনিত রােগ: ছাগলের দেহের ভিতরে ও বাইরে দুই ধরনের পরজীবী দেখা যায়।

দেহের বাইরে চামড়ার মধ্যে উকুন, আটালি ও মাইট হয়ে থাকে। একটি ছাগল দেহের ভিতরে গােলকৃমি, ফিতাকৃমি ও পাতাকৃমি দ্বারা ছাগল বেশি আক্রান্ত হয়।

এরা ছাগলের গৃহীত পুষ্টিকর খাদ্যে ভাগ বসায়। অনেক কৃমি ছাগলের শরীর থেকে রক্ত চুষে নেয়। তাছাড়া প্রায়ই ছাগলের রক্ত আমাশয় হতে দেখা যায়।

এ রােগটি প্রােটোজোয়া দ্বারা হয়ে থাকে। ছাগল মারাত্মক রােগে আক্রান্ত হলে নিম্নলিখিত সাধারণ লক্ষণসমূহ দেখা যায়

  • শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।
  • চামড়ার লোম খাড়া দেখায়।
  • খাদ্য গ্রহণ ও জাবর কাটা বন্ধ হয়ে যায়।
  • ঝিমাতে থাকে ও মাটিতে শুয়ে পড়ে।
  • চোখ দিয়ে পানি ও মুখ দিয়ে লালা নির্গত হয়।

একটি অসুস্থ ছাগল ছাগল ভাইরাস রােগে আক্রান্ত হলে মৃত্যু হতে পারে।

ভাইরাস রােগে আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা করে সুফল পাওয়া যায় না।

ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত রােগেও ছাগলের মৃত্যু হয়ে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে চিকিৎসা করে অনেক ক্ষেত্রেই সুস্থ করে তােলা যায়।

ছাগলের রােগ প্রতিরােধের জন্য ছাগলের খামারে নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ অনুসরণ করতে হবে।

  • ছাগলের ঘর ও এর চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখা।
  • ছাগলকে সময়মতাে টিকা দেওয়া ও কৃমিনাশক ঔষধ খাওয়ানাে।
  • ছাগলকে তাজা খাদ্য খেতে দেওয়া।
  • ছাগলকে সুষম খাদ্য ও পানি সরবরাহ করা।
  • ছাগলের ঘরের মেঝে শুষ্ক রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ছাগলের বিষ্ঠা খামার থেকে দূরে সংরক্ষণ করা।
  • কৃষিজ উৎপাদন ছাগলের খামারে রােগ দেখা দিলে পশুচিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নিম্নোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • অসুস্থ ছাগলকে আলাদা করে পর্যবেক্ষণ করা ও চিকিৎসা দেওয়া।
  • প্রয়ােজনে ছাগলের মলমূত্র পরীক্ষার ব্যবস্থা।

উপরে ছাগল পালন সম্পর্কে আশা করি আপনি অনেক ধারণা অর্জন করতে পেরেছেন।

এখন চলুন ছাগল পোশার সাথে জড়িত অন্যান্য কিছু প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

ছাগল পালন ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ

তো বন্ধুরা আমার জানামতে ছাগলের খামার করার জন্য আপনার তেমন কোন প্রশিক্ষণ গ্রহণ বা ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন হয়ে থাকে না। তাছাড়াও যদি আপনি আরো জানতে চাইছেন এ বিষয়ে, তাহলে এলাকার এসব বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞ মানুষদের পরামর্শ নিয়ে নিতে পারেন।

তাছাড়া যদি আপনার আগে থেকেই ছাগল পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাহলে তো আপনার সকল বিষয়ে মোটামুটিভাবে জানাই রয়েছে।

ছাগলের খামার করতে কত টাকা লাগবে ?

খামার করতে চাইলে আপনাকে কিছু টাকা অবশ্যই invest করতে হবে। কেননা এক্ষেত্রে আপনাকে ভালো জাতের ছাগল কিনে নিতে হবে।

আপনার কতগুলো টাকা খরচ করতে হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। কেননা আপনি যতগুলো ছাগল কিনবেন তার দামও তেমন বেশি হবে। আর ভালো জাতের ছাগল তো অবশ্যই কিনবেন।

উদাহরণস্ব্রুপে, আপনি যদি ১০ টি ভালো জাতের ছাগলের খামার করতে চাইছেন তাহলে আপনাকে কমেও ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে।

আর বাসস্থান তৈরির জন্য কিছু খরচ তো অবশ্যই করতে হবে।

আমার শেষ কথা

বন্ধুরা ছাগল পালন পদ্ধতি সম্পর্কে আমি আর্টিকেলে বিস্তারিত ভাবে আপনাদের বলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

আশা করি ছাগল পালনের বিষয়ে সব কিছু ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন।

আর যদি কোন প্রশ্ন থাকে তাহলে অবশ্যই নিচে কমেন্ট করে আমাকে জানিয়ে দিবেন।

অবশ্যই পড়ুন-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *