জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কি ? এর জনক কে

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কি? বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কাকে বলে? (What is Genetic Engineering in Bengali) এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর জনক কে এসবের বিষয়ে আজকের আর্টিকেলে আমরা জানবো।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কি
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (Genetic Engineering) বলতে কী বোঝায় ?

প্রচারের কারণে জীব প্রযুক্তি বিষয়টা বর্তমানে আমাদের কাছে খুব পরিচিত। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ শুরু হয় অনেক আগে থেকে।

সভ্যতার বিকাশের ধারাবাহিতকায় মানুষ যখন যাযাবর জীবন ছেড়ে স্থায়ী জীবনযাপন শুরু করে, তখন থেকেই জীব প্রযুক্তির উৎপত্তি। কারণ তখন মানুষের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে অধিক ফলনশীল ও পুষ্টিকর গাছপালা এবং শক্ত সমর্থ প্রাণিকূল। এভাবে পছন্দসই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় জীব প্রযুক্তির যাত্রা।

অনেক আগে থেকে মানুষ মদ, বিয়ার, সিরকা, পাউরুটি প্রভৃতি উৎপাদন করেছে অণুজীব বা ব্যাক্টেরিয়াকে কাজে লাগিয়ে। এর পর থেকে বিভিন্ন অণুজীবের জৈবিক কর্মকাণ্ডকে কাজে লাগিয়ে শিল্প ক্ষেত্রে এবং মানবকল্যাণে নতুন নতুন উৎপাদন জীব প্রযুক্তির ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।

জীব প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত গবেষণা জীববিজ্ঞানে নতুন নতুন দিক উন্মোচিত করছে। জীব প্রযুক্তিকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

  • জীব প্রযুক্তি কাকে বলে ?

কেউ কেউ বলেন মানবকল্যাণে প্রয়োগের জন্য জীবকে ব্যবহার করে বিভিন্ন উপাদান তৈরির প্রযুক্তিকে জীব প্রযুক্তি বলা হয়। জীব প্রযুক্তির সর্বসম্মত সংজ্ঞা আজও দেওয়া সম্ভব হয়নি ।

তবে আমেরিকার National Science Foundation প্রদত্ত সংজ্ঞানুযায়ী জীবপ্রযুক্তি বলতে বুঝায় মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে জীব প্রতিনিধিদের, যেমন- অনুজীব বা জীবকোষের কোষীয় উপাদানের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।

দই, সিরকা, পাউরুটি, মদ, পনির ইত্যাদি উৎপাদন জীব প্রযুক্তির ফসল। এসব জীবপ্রযুক্তিকে পুরনো জীব প্রযুক্তি বলে অখ্যায়িত করা হয়।

সম্প্রতি আণবিক জীববিজ্ঞানের গবেষণার দ্বারা জীব প্রযুক্তির যে প্রসার ঘটেছে, তাকে বলা হয় নতুন জীব প্রযুক্তি।

বাস্তবিক অর্থে আধুনিক জীব প্রযুক্তি তিনটি বিষয়ের সমন্বয়। যেমন

  1. অণুজীব বিজ্ঞান
  2. টিস্যু কালচার
  3. জিন প্রকৌশল

তাই জীব প্রযুক্তি একটি সমন্বিত বিজ্ঞান। বর্ণিত তিনটি বিষয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠা জীববিজ্ঞানের অত্যাধুনিক এই শাখাটি মানবসভ্যতার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

আশা করি জীব প্রযুক্তি কাকে বলে এর বিষয়ে আপনারা জানতে পেরেছেন। এখন চলুন জেনে নেওয়া যাক জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কাকে বলে?

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কি ? (What is Genetic Engineering)

বংশানুগতির উপাদানের প্রকৃতি, রাসায়নিক গঠন এবং জৈবনিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিসমূহ আবিষ্কৃত হওয়ার পর বিজ্ঞানীরা আর একটা বিষয় নিয়ে ভাবা শুরু করলেন।

তাঁরা দেখলেন, একটা জীবের সকল জিনই তার জন্য মঙ্গলজনক নয়। এ ভাবনার ফলে স্থাপিত হলো জিন প্রকৌশল নামে জীববিজ্ঞানের এক নতুন শাখা।

একটি জীব থেকে একটি নির্দিষ্ট জিন বহনকারী ডিএনএ খন্ড পৃথক করে ভিন্ন একটি জীবে স্থানান্তরের কৌশলকে জিন প্রকৌশল (Genetic engineering) বলে।

আমরা আরও সহজভাবে বলতে পারি কাঙ্ক্ষিত নতুন বৈশিষ্ট্য সৃষ্টির জন্য কোনো জীবের DNA এর পরিবর্তন ঘটানোকে জিন প্রকৌশল বলে।

এই জিন যে কৌশলগুলোর মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয় তাদের একত্রে রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ কৌশল বলে।

বিকম্বিনেন্ট ডিএনএ কৌশল অবলম্বন করে একটি ডিএনএ অণুর কাঙ্খিত অংশ কেটে আলাদা করে অন্য একটি ডিএনএ অণুতে প্রতিস্থাপনের ফলে যে নতুন ডিএনএ অণুর সৃষ্টি হয়, তাকে রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ বলে।

  • জিন ক্লোনিং কি ?

রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরির প্রক্রিয়াকে রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি বা জিন ক্লোনিং বলা হয়।

মানুষের অন্তে বসবাস করে একধরনের ব্যাক্টেরিয়া যার নাম Escheretia coli। এই ব্যাক্টেরিয়ার ওপর গবেষণা করে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধিকাংশ কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছে।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রস্তুত করার ধাপসমূহ

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি নিচে বর্ণিত ধাপগুলো অবলম্বন করে সম্পন্ন করা হয়-

১. প্রথমে দাতা জীব থেকে কাঙ্ক্ষিত জিনসহ ডিএনএ অণু পৃথক করা হয়। এরপর এই জীনের বাহক বা ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যাক্টেরিয়ার প্লাজমিড ডিএনএ পৃথক করা হয়। প্লাজমিড হচ্ছে ব্যাক্টেরিয়া কোষের ক্রোমোজোমের বাইরে আরেকটি স্বতন্ত্র ডিএনএ এবং এটি স্ববিভাজনে সক্ষম।

২. এ ধাপে প্লাজমিড ডিএনএ এবং দাতা ডিএনএ এক বিশেষ ধরনের উৎসেচক (এনজাইম) দ্বারা খণ্ডিত করা হয়। দাতা ডিএনএর এসব খন্ডের কোনো একটিতে কাঙ্ক্ষিত জিনটি থাকে।

৩. এ ধাপে লাইগেজ নামক একধরনের এনজাইম দ্বারা দাতা ডিএনএ কে প্লাজমিড ডিএনএ এর কর্তিত প্রান্তে স্থাপন করা হয়। লাইগেজ এখানে আঠার মতো কাজ করে। ফলে নির্দিষ্ট জিনসহ রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্লাজমিড সৃষ্টি হয়। এই রিকম্বিনেন্ট প্লাজমিডগুলো এখন দাতা ডিএনএ এর বিভিন্ন খন্ডিত অংশ বহন করে।

৪. এখন এই রিকম্বিনেন্ট প্লাজমিডকে ট্রান্সফরমেশন পদ্ধতিতে ব্যাক্টেরিয়ায় প্রবেশ করান হয়। খণ্ডিত ডিএনএ গ্রাহক কোষে প্রবেশ করানোর পদ্ধতিকে ট্রান্সফরমেশন বলে। ট্রান্সফরমেশনের ফলে নতুন জিন নিয়ে যে ব্যাকটেরিয়া বা জীবের উদ্ভব ঘটে তাকে ট্রান্সজেনিক জীব বলে।

৫. এরপর রিকম্বিনেনন্ট প্লাজমিড বাহিত ব্যাক্টেরিয়াকে পৃথক করা এবং নির্দিষ্ট জিন বহনকারী ব্যাক্টেরিয়াকে শনাক্ত করা হয়। নির্দিষ্ট জিন বহনকারী ব্যাক্টেরিয়াগুলোর ব্যাপক বংশবৃদ্ধি ঘটানো হয়, এটি হচ্ছে জিন ক্লোনিং, যার ফলে জিনের বহু কপি তৈরি হয়। এভাবে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য বা গুণ বহনকারী জিনের বহুগুণন ঘটানো হয়।

আধুনিক জীবপ্রযুক্তি বা জিন কৌশলের মাধ্যমে জিন স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য অল্প সময়ে সুচারুভাবে স্থানান্তর করা সম্ভব হয় বলে সংশ্লিষ্ট উদ্ভাবক বা উদ্দ্যোক্তাগণের নিকট প্রচলিত প্রজননের তুলনায় এ প্রযুক্তিটি অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর জনক কে ?

১৯৭১ মতান্তরে ১৯৭২ সালে বিজ্ঞানী Paul Berg lambda virus এবং বানরের ভাইরাস SV40 এর DNA এর সংযোগ ঘটিয়ে বিশ্বের প্রথম রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ অণু তৈরি করেন। তাই Paul Berg কে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর জনক বলা হয়।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর অপর নাম কি ?

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (Genetic Engineering) এর অপর নাম জিন প্রকৌশল।

তাহলে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কি বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কাকে বলে এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর জনক কে এইসব বিষয়ে আশা করি আজকের এই আর্টিকেলে জানতে পেরেছেন।

আর্টিকেলটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না।

অবশ্যই পড়ুন-

About Author

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *