পর্যায় সারণি কাকে বলে ? আধুনিক পর্যায় সারণির বৈশিষ্ট্য

আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা পর্যায় সারণি কাকে বলে, পর্যায় সারণির বৈশিষ্ট্য এবং‌ সুবিধা গুলোর বিষয়ে জানব। আপনারা‌ নিচে পর্যায় সারণির বিষয়ে সবকিছু ভালোভাবে জানতে পারবেন।

পর্যায় সারণি কাকে বলে

পর্যায় সারণি কি?

2016 সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে মোট 118 টি মৌলিক পদার্থ আবিষ্কৃত হয়েছে।

রসায়ন অধ্যয়ন ও গবেষণার জন্য সব কয়টি মৌলের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।

যেহেতু মৌলিক পদার্থগুলোর মধ্যে কিছু মৌলিক পদার্থ একই রকম ধর্ম প্রদর্শন করে। তাই যে সকল মৌলিক পদার্থ একই রকম ধর্ম প্রদর্শন করে তাদেরকে একই গ্রুপে রেখে সমগ্র মৌলিক পদার্থের জন্য একটি ছক তৈরি করার চেষ্টা দীর্ঘদিন থেকেই চলছিল।

কয়েক শত বছর ধরে বিভিন্ন বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টা, অনেক পরিবর্তন, পরিবর্ধনের ফলে আমরা মৌলগুলো সাজানোর এই ছকটি পেয়েছি, যেটা পর্যায় সারণি বা Periodic table নামে পরিচিত।

পর্যায় সারণি কাকে বলে ?

যেসকল মৌলিক পদার্থ একই ধর্ম প্রদর্শন করে তাদেরকে একই গ্রুপে রেখে বিজ্ঞানিরা শত শত বছর ধরে একটি ছক তৈরি করার চেষ্টা করেছেন এবং আমরা মৌলগুলো সাজানোর এটি ছক পেয়েছি, একে পর্যায় সারণি বলে।

এ পর্যায় সারণি রসায়নের জগতে বিজ্ঞানীদের এক অসামান্য অবদান। এ পর্যায় সারণি এবং তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কারও ভালো ধারণা থাকলে শুধু এই 118 টি মৌলের বিভিন্ন ধর্ম নয় বরং এ সকল মৌল দ্বারা গঠিত অসংখ্য যৌগের ধর্মাবলি সম্পর্কে সাধারণ ধারণা জন্মে।

পর্যায় সারণির পটভূমি এবং আধুনিক পর্যায় সারণির জনক কে ?

মানুষ প্রাচীনকাল থেকে বিক্ষিপ্তভাবে পদার্থ এবং তাদের ধর্ম সম্পর্কে যে সকল ধারণা অর্জন করেছিল পর্যায় সারণি হচ্ছে তার একটি সম্মিলিত রূপ।

পর্যায় সারণি একজন বিজ্ঞানীর একদিনের পরিশ্রমের ফলে তৈরি হয়নি। অনেক বিজ্ঞানীর অনেক দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আজকের এই আধুনিক পর্যায় সারণি তৈরি হয়েছে।

1789 সালে ল্যাভয়সিয়ে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন, ফসফরাস, মার্কারি, জিংক এবং সালফার ইত্যাদি মৌলিক পদার্থসমূহকে ধাতু ও অধাতু এই দুই ভাগে ভাগ করেন।

ল্যাভয়সিয়ের সময় থেকেই মৌলগুলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করার চিন্তা ভাবনা শুরু হয় যেন একই ধরনের মৌলিক পদার্থগুলো একটি নির্দিষ্ট ভাগে থাকে।

1829 সালে বিজ্ঞানী ডোবেরাইনার লক্ষ করেন তিনটি করে মৌলিক পদার্থ একই রকমের ধর্ম প্রদর্শন করে। তিনি প্রথমে পারমাণবিক ভর অনুসারে তিনটি করে মৌল সাজান।

এরপর তিনি লক্ষ করেন দ্বিতীয় মৌলের পারমাণবিক ভর প্রথম ও তৃতীয় মৌলের পারমাণবিক ভরের যোগফলের অর্ধেক বা তার কাছাকাছি, একে ডোবেরাইনারের ত্রয়ীসূত্র বলে।

বিজ্ঞানী ডোবেরাইনার ক্লোরিন, ব্রোমিন ও আয়োডিনকে প্রথম ত্রয়ী মৌল হিসেবে চিহ্নিত করেন।

1864 সাল পর্যন্ত আবিষ্কৃত মৌলসমূহের জন্য নিউল্যান্ড অষ্টক সূত্র নামে একটি সূত্র প্রদান করেন। এই সূত্র অনুযায়ী মৌলসমূহকে যদি পারমাণবিক ভরের ছোট থেকে বড় অনুযায়ী সাজানো যায় তবে যেকোনো একটি মৌলের ধর্ম তার অষ্টম মৌলের ধর্মের সাথে মিলে যায়।

1869 সালে রাশিয়ান বিজ্ঞানী মেন্ডেলিফ সকল মৌলের ধর্ম পর্যালোচনা করে একটি পর্যায় সূত্র প্রদান করেন। সূত্রটি হলো: “মৌলসমূহের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মাবলি তাদের পারমাণবিক ভর বৃদ্ধির সাথে পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়।”

এ সূত্র অনুসারে তিনি তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত 63 টি মৌলকে 12 টি আনুভূমিক সারি আর ৪ টি খাড়া কলামের একটি ছকে পারমাণবিক ভর বৃদ্ধি অনুসারে সাজিয়ে দেখান যে, একই কলাম বরাবর সকল মৌলগুলোর ধর্ম একই রকমের এবং একটি সারির প্রথম মৌল থেকে শেষ মৌল পর্যন্ত মৌলগুলোর ধর্মের ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন ঘটে।

এই ছকের নাম দেওয়া হয় পর্যায় সারণি (Periodic Table)।

মেন্ডেলিফের পর্যায় সারণির আরেকটি সাফল্য হচ্ছে কিছু মৌলিক পদার্থের অস্তিত্ব সম্পর্কে সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী।

সে সময় মাত্র 63 টি মৌল আবিষ্কৃত হওয়ার কারণে পর্যায় সারণির কিছু ঘর ফাঁকা থেকে যায়। মেন্ডেলিফ এই ফাঁকা ঘরগুলোর জন্য যে মৌলের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন পরবর্তীতে সেগুলো সত্য প্রমাণিত হয়।

আধুনিক পর্যায় সারণি কতগুলো আনুভূমিক সারি এবং কতগুলো খাড়া কলাম নিয়ে গঠিত।

সারিগুলোকে পর্যায় এবং খাড়া কলামগুলোকে গ্রুপ বা শ্রেণি বলে। আধুনিক পর্যায় সারণির বর্গাকার ঘরগুলোতে মোট 118 টি মৌল আছে। পর্যায় সারণিটি এই অধ্যায়ের শুরুতে দেখানো হয়েছে।

আধুনিক পর্যায় সারণির বৈশিষ্ট্য গুলো কি কি ?

আধুনিক পর্যায় সারণির অনেক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পর্যায় সারণির দিকে লক্ষ রাখলে এই বৈশিষ্ট্যগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে।

  • পর্যায় সারণিতে 7 টি পর্যায় (Period) বা অনুভূমিক সারি এবং 18 টি গ্রুপ বা খাড়া স্তম্ভ
  • (প্রতিটি পর্যায় বাম দিকে গ্রুপ 1 থেকে শুরু করে ডানদিকে গ্রুপ 18 পর্যন্ত বিস্তৃত।
  • মূল পর্যায় সারণির নিচে আলাদাভাবে ল্যান্থানাইড ও অ্যাকটিনাইড সারির মৌল হিসেবে দেখানো হলেও এগুলো যথাক্রমে 6 এবং 7 পর্যায়ের অংশ ।
  • পর্যায় 1 এ শুধু 2 টি মৌল রয়েছে ।
  • পর্যায় 2 এবং পর্যায় 3 এ ৪ টি করে মৌল রয়েছে।
  • পর্যায় 4 এবং পর্যায় 5 এ 18 টি করে মৌল রয়েছে।
  • পর্যায় 6 এবং পর্যায় 7 এ 32 টি করে মৌল রয়েছে।
  • গ্রুপ 1 এ 7 টি মৌল রয়েছে । ( ii ) গ্রুপ 2 এ 6 টি মৌল রয়েছে।
  • গ্রুপ 3 এ 32 টি মৌল রয়েছে।
  • গ্রুপ 4 থেকে গ্রুপ 12 পর্যন্ত প্রত্যেকটি গ্রুপে 4 টি করে মৌল রয়েছে।
  • গ্রুপ 13 থেকে গ্রুপ 17 পর্যন্ত প্রত্যেকটিতে 6 টি করে মৌল রয়েছে।
  • গ্রুপ 18 এ 7 টি মৌল রয়েছে।

যে সকল মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা 57 থেকে 71 পর্যন্ত এরকম 15 টি মৌলকে ল্যান্থানাইড সারির মৌল বলা হয়।

যে সকল মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা 89 থেকে 103 পর্যন্ত এরকম 15 টি মৌলকে অ্যাকটিনাইড সারির মৌল বলা হয়। ল্যান্থানাইড সারির মৌলগুলোর ধর্ম এত কাছাকাছি এবং অ্যাকটিনাইড সারির মৌলসমূহের ধর্ম এত কাছাকাছি যে তাদেরকে পর্যায় সারণির নিচে ল্যান্থানাইড সারির মৌল এবং অ্যাকটিনাইড সারির মৌল হিসেবে আলাদাভাবে রাখা হয়েছে।

যদি মৌলগুলোর ধর্মের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয় তাহলে নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ করা যায়:

  1. একই পর্যায়ের বাম থেকে ডানের দিকে গেলে মৌলসমূহের ধর্ম ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়।
  2. একই গ্রুপের মৌলগুলোর ভৌত এবং রাসায়নিক ধর্ম প্রায় একই রকমের হয়।

পর্যায় সারণি কাকে বলে বা পর্যায় সারণি কি এ বিষয়ে তাহলে আশা করি জানতে পেরেছেন।‌‌ সেই সাথে পর্যায় সরণির বৈশিষ্ট্য গুলোও জানতে পেরেছেন।

Read More:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *