Skip to content

বিজয় দিবস রচনা: The Victory Day Essay In Bengali

আজকের এই আর্টিকেলটিতে বিজয় দিবস রচনা উল্লেখ করা হয়েছে। আপনি যদি বিজয় দিবস উপলক্ষে একটি সুন্দর রচনা খুঁজছেন তাহলে নিচে দেখে নিন The Victory Day Of Bangladesh Essay In Bengali.

বিজয় দিবস রচনা

Mohan Bijoy Dibos Rochona.

মহান বিজয় দিবস রচনা

ভূমিকা:

১৬ ই ডিসেম্বর আমাদের গৌরবময় বিজয় দিবস। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন, শােষণ, নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতা ঘােষণার পর দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ বিজয় অর্জিত হয়। একাত্তরের ১৬ ই ডিসেম্বর বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ। এই দিনটি তাই বাঙালি জাতির জীবনের একটি অবিস্মরণীয় দিন।

মহান বিজয় দিবসের প্রেক্ষাপট:

জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। শুরু হয় পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন, শােষণ, নির্যাতন। দিনের পর দিন বাঙালির ওপর অত্যাচার, নির্যাতন ও শােষণ চালাতে থাকে পাকিস্তানি বর্বর শাসকগােষ্ঠী। বাধ্য হয়ে এই শাসন-শােষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালি গড়ে তােলে আন্দোলন সংগ্রাম। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ এর ৬ দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচনে মধ্য দিয়ে বাঙালি অধিকার আদায়ের জন্য তৎপর হতে থাকে।

এসব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৬ ই ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে।

বাঙালিদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা:

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর এদেশের মানুষের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করে দেয় পাক শাসকগােষ্ঠী। তারা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে রীতিমতাে অবজ্ঞা – অবহেলা করতে থাকে এবং এদেশের জনগণকে শােষণের বস্তুতে পরিণত করে। তাদের ন্যায্য অধিকার না দিয়ে মৌলিক অধিকারগুলাে একে একে কেড়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করে। তারা সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে বাঙালিকে অবমূল্যায়ন করতে থাকে।

তাই নয়, তারা বাঙালির মাতৃভাষাকে কেড়ে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চায়। এমনকি ৭০ এর নির্বাচনে জয়লাভ করার পরও তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে না। এমন অবিচার ও বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে বাঙালি একটি নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে। অবশেষে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে তাদের সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে।

মুক্তিযুদ্ধ ও আত্মত্যাগ:

১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সােহরাওয়ার্দী উদ্যানে) প্রায় দশ লাখ মানুষের সমাবেশে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। তিনি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে, যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মােকাবিলা করার আহ্বান জানান।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকে সমগ্র জাতি। ২৫ শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। মধ্যরাতের পর হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রেফতারের পূর্বেই, অর্থাৎ ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘােষণা করেন। এর পরপরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলে এই যুদ্ধ। পাক হানাদার বাহিনী বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে ভেঙে দিতে শুরু করে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা। গণহত্যার পাশাপাশি নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, শহরের পর শহর, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় তারা। বাংলাদেশ পরিণত হয় ধ্বংসস্তুপে।

৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহিদ হয় । সম্ভম হারায় দুই লাখের বেশি মা বােন। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অদম্য জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করে এদেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক, নারীসহ সকল শ্রেণি পেশার সর্বস্তরের বাঙালি। বাঙালি জাতির মরণপণ যুদ্ধ এবং দুর্বার প্রতিরােধের মুখে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পরাজয়ের আভাস পায় এবং বিজয়ের দুই দিন আগে জাতির সূর্য সন্তান বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যা করে।

অবশেষে বাঙালির দুর্বার প্রতিরােধের মুখে ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় নতুন স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব:

যেকোনাে আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনার জন্য বিচক্ষণ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব অপরিহার্য। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আন্দোলনেও তেমনই এক বলিষ্ঠ নেতৃত্ব হলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার কোটি কোটি মানুষকে তিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন একদল বিচক্ষণ রাজনৈতিক নেতা। জেল জুলুম নির্যতন সত্ত্বেও এ নেতৃত্ব তাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি।

শত্রুর রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করে তারা বাংলাদেশের মানুষকে বিজয়ের স্বপ্নে উজ্জীবিত করেছেন, ঐক্যবদ্ধ করেছেন। বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতার ঘােষণা দিয়ে অধিকার আদায়ে সবাইকে ঝাপিয়ে পড়ার মন্ত্রণা জুগিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তার নির্দেশনা অনুসরণ করেই অর্জিত হয়েছে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। তাই এমন তেজোদীপ্ত, দেশপ্রেমিক নেতৃত্বকে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

বিজয় দিবস উদযাপন:

১৬ ডিসেম্বর বাঙালির বিজয়ােৎসবের দিন। এদিন ভােরে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারী লাখো শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের জনগণ সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে মিলিত হয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। দিবসটিকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ সরকার এদিন সাধারণ ছুটি ঘােষণা করেছে।

এছাড়াও এদিন জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে বাংলাদেশের সকল সামরিক ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর অংশগ্রহণে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের আয়ােজন করা হয়। বিজয় দিবসের এ দিনে সারাদেশের সমস্ত স্কুল – কলেজ, ঘর – বাড়ি, দােকান – পাট ও যানবাহনে লাল – সবুজ পতাকা দেখা যায়। নিব্যাপী রেডিও – টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। সারাদেশের সকল মসজিদ – মন্দির – গির্জা – প্যাগােডায় মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের আত্মার শান্তি কামনা করে প্রার্থনা করা হয়। মােটকথা, দেশের প্রতি জেলায়, প্রতি ঘরে বিজয়ের এ দিনটি আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালন করা হয়।

বিজয় দিবসের তাৎপর্য:

স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল একরাশ স্বপ্ন বুকে নিয়ে। ৪৭ বছরের এ পথপরিক্রমায় সে স্বপ্নের কতটা পূরণ হয়েছে, আজ সে হিসাব মেলাতে চাইবে সবাই। এর মধ্যে আমাদের অনেক চড়াই উতরাই মােকাবিলা করতে হয়েছে। রাজনীতি এগিয়েছে অমসৃণ পথে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায়।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন দিনগুলােতেই স্বাধীন দেশের উপযােগী একটি সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়ােজন ছিল গণতান্ত্রিক ও মুক্ত পরিবেশের । সদ্য স্বাধীন দেশের নেতৃত্বের এ বিষয়ে অঙ্গীকারের অভাব ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পরবর্তী সময়ে জাতীয় চার নেতাসহ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুতে এ ক্ষেত্রে মারাত্মক বিচ্যুতি ঘটে এবং তার খেসারত দিতে হয় জাতিকে। এছাড়াও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও দারিদ্র্য এখনাে প্রকট। গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা পেলেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলাে সময়ের সঙ্গে শক্তিশালী হতে পারেনি আজও। রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর বিভক্তি, অনৈক্য আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বড়াে বাধা। এতদসত্ত্বেও আমাদের সামনে সম্ভাবনা অসীম। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এসব সমস্যা মােকাবিলায় সচেষ্ট হলে আমাদের অগ্রগতি ঘটবে দ্রুত। বিভেদ ভুলে আমরা সে পথেই অগ্রসর হব এই হােক বিজয় দিবসের অঙ্গীকার।

অর্থবহ বিজয়ের জন্য করণীয়:

বিজয়ের এত বছর পর উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার শর্ত পূরণ করেছে বাংলাদেশ। তবে অর্থনৈতিকভাবে আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। এ লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত মূল্যবােধ রক্ষায় তৎপর হতে হবে। তবেই বিজয় হয়ে উঠবে অর্থবহ। যেকোনাে জাতির শক্তির প্রধান উৎস ঐক্য। প্রায় সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতির জন্য প্রয়ােজন এটি।

মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়ের পেছনে কাজ করেছিল মত, পথ, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সবার এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ। এ জন্যই আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে মাত্র নয় মাসে পরাজিত করা সম্ভব হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার পর আমরা সেই ঐক্য ধরে রাখতে পারিনি। গুরুত্বহীন বিষয়েও রাজনৈতিক বিভক্তি দেশে গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার পথে বড়াে অন্তরায় হয়ে উঠেছে।

এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের নেতৃত্বকে। সেই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলােয় অভিন্ন নীতি অনুসরণ অপরিহার্য। সর্বোপরি যে ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, সহিষ্ণু ও সমতাভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন শহিদরা দেখেছিলেন, সেই লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় নীতি পরিচালিত হবে, এটাই প্রত্যাশিত।

উপসংহার:

বিজয় দিবস বাঙালির জীবনে একই সাথে আনন্দের দিন, আবার বেদনারও দিন। প্রতি বছর এ দিবসটি আমাদের মাঝে ঘুরে ফিরে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী লাখাে শহিদের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে যায়। প্রিয় মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষার মহান ইতিহাসের স্মরণে প্রতিবছর বিজয় দিবস অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে পালিত হয়ে আসছে। তবে দিবসটি শুধু পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর তাৎপর্য অনুধাবন ও জাতি হিসেবে আমাদের করণীয় ঠিক করতে পারলেই বিজয়ের আনন্দ পূর্ণতা পাবে।

Learn More:

বিজয় দিবস রচনা: ১৬ই ডিসেম্বর

সূচনা:

বাঙালির জাতীয় জীবনে একটি উজ্জ্বল দিন বিজয় দিবস। লাখো শহিদের আত্মত্যাগ, স্বজন হারানোর বেদনা ও বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় মুক্তিযুদ্ধের মহান বিজয়। এই দিনে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী বীর বাঙালির কাছে পরাজয় স্বীকার করে। তাদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে জন্ম হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। তাই বিজয় দিবস আমাদের আত্মমর্যাদা, বীরত্ব ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক।

বিজয় দিবসের তাৎপর্য:

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পেরিয়ে গেছে অনেক বছর। কিন্তু বিজয় দিবসের গুরুত্ব কমেনি এতটুকু। এই দিনটির মাধ্যমেই আমরা নতুন প্রজন্মকে এবং বিশ্বকে বার বার মনে করিয়ে দিই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা, শহিদদের কথা। মনে করিয়ে দিই বাংলাদেশ নামে একটি দেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা, যা প্রত্যেক বাঙালি তার হৃদয়ে ধারণ করে আছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি:

বাংলাদেশের বিজয় দিবসের পটভূমিতে রয়েছে দুই দশকের আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। সে ইতিহাসের প্রথম মাইলফলক ভাষা আন্দোলন। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উন্মেষ ঘটেছিল বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা। এই চেতনা ক্রমে বিকশিত হয়ে স্বাধিকার আন্দোলনে পরিণত হয়। ১৯৬২ র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ র ছয় দফা আন্দোলন ও ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে ১৯৭১ এর ৭ মার্চে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে স্বাধিকার আন্দোলন চরম শক্তি লাভ করে। বাঙালি জাতি স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালি জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

২৫ মার্চ মধ্যরাত শেষে, অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এ ঘোষণার পরেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় কারাগারে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমগ্র জাতি ঝাপিয়ে পড়ে প্রতিরোধ সংগ্রামে। ৯ মাস সশস্ত্র সংগ্রামের পর বিজয় ছিনিয়ে আনে মুক্তিযোদ্ধারা। পাকিস্তানি বাহিনী পরাজয় স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করে। ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ ঐতিহাসিক ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল। দিনটি পরবর্তীকালে জাতীয় ইতিহাসে বিজয় দিবস হিসেবে মর্যাদা পায়।

বিজয় দিবস উদযাপন:

স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন বাংলাদেশের অসংখ্য বীর শহিদ। তাঁদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এ দিবসে সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে সর্বস্তরের জনগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। তোপধ্বনির মাধ্যমে খুব ভোরে দিবসটির সূচনা ঘোষিত হয়। বিজয় দিবসের দিন সারাদেশে লাল সবুজের সাজ দেখা যায়। বাড়ির ছাদে, দোকানে, রাস্তার পাশে, গাড়ির সামনে, স্কুল কলেজে, এমনকি রিকশার হ্যান্ডেলেও শোভা পায় আমাদের লাল সবুজ পতাকা। দেশ জুড়ে শুরু হয় উৎসবের আমেজ।

রাজধানী ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী আয়োজন করে নানা অনুষ্ঠানের স্বাধীনতার আবেগে উদ্বেলিত নারী পুরুষ উৎসবের সাজে সেজে সেখানে জড়ো হয়। স্কুল কলেজে শিক্ষার্থীরা নানারকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এদিন সকালবেলা ঢাকার জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা এ কুচকাওয়াজে অংশ নেয়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, কূটনীতিবিদ, গণমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষ এ কুচকাওয়াজ উপভোগ করে। বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় বিজয় মেলার। দেশের প্রতিটি জেলায় উৎসবমুখর পরিবেশে এ দিনটি পালিত হয়।

বিজয় দিবসের চেতনা বাঙালির বিজয়ের পথ লাখো শহিদের রক্তে রাঙা। বিজয় দিবস তাই আমাদের মনে সঞ্চার করে গভীর দেশপ্রেম। পূর্বপুরুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস আমাদের গর্বিত করে। দৃপ্তপদে সামনে এগিয়ে চলার প্রেরণা জোগায়। যেকোনো মূল্যে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নতুন করে অঙ্গীকারাবদ্ধ হই আমরা।

উপসংহার:

বিজয় দিবস শুধুই আমাদের বিজয়ের দিন নয়, এটি আমাদের চেতনা জাগরণেরও দিন। তাই এই দিনে প্রতিটি বাঙালি নতুন করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় দেশকে গড়তে। সবার প্রত্যাশা বিশ্বসভায় আমরাও যেন সবার সামনের সারিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি, যেন গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারি , অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে পারি, অশিক্ষা ও দারিদ্র্য থেকে দেশকে মুক্ত করে একুশ শতকের অগ্রযাত্রায় শামিল হতে পারি। তাহলেই আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতার বিজয় যথার্থ অর্থবহ হয়ে উঠবে।

Note: এই বিজয় দিবস রচনা গুলো আপনি রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলে সেখানে উপস্থাপন করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.