রচনা: বিজয় দিবস – মহান বিজয় দিবস রচনা

রচনা: বিজয় দিবস

আপনি কি বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবস রচনা খুঁজছেন তাহলে নিচে থেকে দেখে নিন বিজয় দিবস সম্পর্কে একটি সুন্দর রচনা।

বিজয় দিবস রচনা

বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবস: ১৬ই ডিসেম্বর

মহান বিজয় দিবস রচনা – ১৬ ই ডিসেম্বর

ভূমিকা: ১৬ ই ডিসেম্বর আমাদের গৌরবময় বিজয় দিবস । পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন , শােষণ , নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতা ঘােষণার পর দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ বিজয় অর্জিত হয় । একাত্তরের ১৬ ই ডিসেম্বর বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ । এই দিনটি তাই বাঙালি জাতির জীবনের একটি অবিস্মরণীয় দিন ।

মহান বিজয় দিবসের প্রেক্ষাপট: জিন্নাহর দ্বি – জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয় । শুরু হয় পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন , শােষণ , নির্যাতন । দিনের পর দিন বাঙালির ওপর অত্যাচার , নির্যাতন ও শােষণ চালাতে থাকে পাকিস্তানি বর্বর শাসকগােষ্ঠী । বাধ্য হয়ে এই শাসন – শােষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালি গড়ে তােলে আন্দোলন সংগ্রাম । বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন , ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন , ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন , ৬৬ এর ৬ দফা , ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান , ৭০ এর নির্বাচনে মধ্য দিয়ে বাঙালি অধিকার আদায়ের জন্য তৎপর হতে থাকে । এসব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হয়ে ওঠেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে । যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৬ ই ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে ।

বাঙালিদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা: ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর এদেশের মানুষের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করে দেয় পাক শাসকগােষ্ঠী । তারা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে রীতিমতাে অবজ্ঞা – অবহেলা করতে থাকে এবং এদেশের জনগণকে শােষণের বস্তুতে পরিণত করে । তাদের ন্যায্য অধিকার না দিয়ে মৌলিক অধিকারগুলাে একে একে কেড়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করে । তারা সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে বাঙালিকে অবমূল্যায়ন করতে থাকে ।

তাই নয় , তারা বাঙালির মাতৃভাষাকে কেড়ে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চায় । এমনকি ৭০ এর নির্বাচনে জয়লাভ করার পরও তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে না । এমন অবিচার ও বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে বাঙালি একটি নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে । অবশেষে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে তাদের সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে ।

মহান বিজয় দিবস রচনা

মুক্তিযুদ্ধ ও আত্মত্যাগ : ১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমানে সােহরাওয়ার্দী উদ্যানে ) প্রায় দশ লাখ মানুষের সমাবেশে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন । তিনি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে , যার যা কিছু আছে , তাই নিয়ে শত্রুর মােকাবিলা করার আহ্বান জানান । বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকে সমগ্র জাতি । ২৫ শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে । মধ্যরাতের পর হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । গ্রেফতারের পূর্বেই , অর্থাৎ ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘােষণা করেন । এর পরপরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী । শুরু হয় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ । দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলে এই যুদ্ধ । পাক হানাদার বাহিনী বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে ভেঙে দিতে শুরু করে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা । গণহত্যার পাশাপাশি নারী নির্যাতন , ধর্ষণ , শহরের পর শহর , গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় তারা । বাংলাদেশ পরিণত হয় ধ্বংসস্তুপে । ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহিদ হয় । সম্ভম হারায় দুই লাখের বেশি মা – বােন । আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অদম্য জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করে এদেশের কৃষক , শ্রমিক , ছাত্র , যুবক , নারীসহ সকল শ্রেণি – পেশার সর্বস্তরের বাঙালি । বাঙালি জাতির মরণপণ যুদ্ধ এবং দুর্বার প্রতিরােধের মুখে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পরাজয়ের আভাস পায় এবং বিজয়ের দুই দিন আগে জাতির সূর্য সন্তান বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যা করে । অবশেষে বাঙালির দুর্বার প্রতিরােধের মুখে ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে । এর মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় নতুন স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ ।

বলিষ্ঠ নেতৃত্ব : যেকোনাে আন্দোলন – সংগ্রাম পরিচালনার জন্য বিচক্ষণ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব অপরিহার্য । বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আন্দোলনেও তেমনই এক বলিষ্ঠ নেতৃত্ব হলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার কোটি কোটি মানুষকে তিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন । তার সঙ্গে ছিলেন একদল বিচক্ষণ রাজনৈতিক নেতা । জেল – জুলুম – নির্যতন সত্ত্বেও এ নেতৃত্ব তাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি । শত্রুর রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করে তারা বাংলাদেশের মানুষকে বিজয়ের স্বপ্নে উজ্জীবিত করেছেন , ঐক্যবদ্ধ করেছেন । বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতার ঘােষণা দিয়ে অধিকার আদায়ে সবাইকে ঝাপিয়ে পড়ার মন্ত্রণা জুগিয়েছেন বঙ্গবন্ধু । তার নির্দেশনা অনুসরণ করেই অর্জিত হয়েছে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা । তাই এমন তেজোদীপ্ত , দেশপ্রেমিক নেতৃত্বকে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

বিজয় দিবস উদযাপন : ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির বিজয়ােৎসবের দিন । এদিন ভােরে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারী লাখো শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের জনগণ সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে মিলিত হয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে । দিবসটিকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ সরকার এদিন সাধারণ ছুটি ঘােষণা করেছে । এছাড়াও এদিন জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে বাংলাদেশের সকল সামরিক ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর অংশগ্রহণে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের আয়ােজন করা হয় । বিজয় দিবসের এ দিনে সারাদেশের সমস্ত স্কুল – কলেজ , ঘর – বাড়ি , দােকান – পাট ও যানবাহনে লাল – সবুজ পতাকা দেখা যায় । নিব্যাপী রেডিও – টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয় । সারাদেশের সকল মসজিদ – মন্দির – গির্জা – প্যাগােডায় মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের আত্মার শান্তি কামনা করে প্রার্থনা করা হয় । মােটকথা , দেশের প্রতি জেলায় , প্রতি ঘরে বিজয়ের এ দিনটি আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালন করা হয় ।

রচনা – বিজয় দিবস

বিজয় দিবসের তাৎপর্য : স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল একরাশ স্বপ্ন বুকে নিয়ে । ৪৭ বছরের এ পথপরিক্রমায় s সে স্বপ্নের কতটা পূরণ হয়েছে , আজ সে হিসাব মেলাতে চাইবে সবাই । এর মধ্যে আমাদের অনেক চড়াই – উতরাই মােকাবিলা করতে হয়েছে । রাজনীতি এগিয়েছে অমসৃণ পথে । গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় । যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন দিনগুলােতেই স্বাধীন দেশের উপযােগী একটি সংবিধান প্রণয়ন করা হয় । মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়ােজন ছিল গণতান্ত্রিক ও মুক্ত পরিবেশের । সদ্য স্বাধীন দেশের নেতৃত্বের এ বিষয়ে অঙ্গীকারের অভাব ছিল না । কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে , পরবর্তী সময়ে জাতীয় চার নেতাসহ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুতে এ ক্ষেত্রে মারাত্মক বিচ্যুতি ঘটে এবং তার খেসারত দিতে হয় জাতিকে । এছাড়াও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও দারিদ্র্য এখনাে প্রকট । গণতন্ত্র , বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা পেলেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলাে সময়ের সঙ্গে শক্তিশালী হতে পারেনি আজও । রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর বিভক্তি ; অনৈক্য আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বড়াে বাধা । এতদসত্ত্বেও আমাদের সামনে সম্ভাবনা অসীম । একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এসব সমস্যা মােকাবিলায় সচেষ্ট হলে আমাদের অগ্রগতি ঘটবে দ্রুত । বিভেদ ভুলে আমরা সে পথেই অগ্রসর হব এই হােক বিজয় দিবসের অঙ্গীকার ।

অর্থবহ বিজয়ের জন্য করণীয়: বিজয়ের এত বছর পর উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার শর্ত পূরণ করেছে বাংলাদেশ । তবে অর্থনৈতিকভাবে আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে । এ লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত মূল্যবােধ রক্ষায় তৎপর হতে হবে । তবেই বিজয় হয়ে উঠবে অর্থবহ । যেকোনাে জাতির শক্তির প্রধান উৎস ঐক্য । প্রায় সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতির জন্য প্রয়ােজন এটি । মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়ের পেছনে কাজ করেছিল মত – পথ – জাতি – ধর্ম নির্বিশেষে সবার এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ । এ জন্যই আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে মাত্র নয় মাসে পরাজিত করা সম্ভব হয়েছিল । দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার পর আমরা সেই ঐক্য ধরে রাখতে পারিনি । গুরুত্বহীন বিষয়েও রাজনৈতিক বিভক্তি দেশে গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার পথে বড়াে অন্তরায় হয়ে উঠেছে । এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের নেতৃত্বকে । সেই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলােয় অভিন্ন নীতি অনুসরণ অপরিহার্য । সর্বোপরি যে ন্যায়ভিত্তিক , গণতান্ত্রিক , সহিষ্ণু ও সমতাভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন শহিদরা দেখেছিলেন , সেই লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় নীতি পরিচালিত হবে , এটাই প্রত্যাশিত ।

উপসংহার: বিজয় দিবস বাঙালির জীবনে একই সাথে আনন্দের দিন , আবার বেদনারও দিন । প্রতি বছর এ দিবসটি আমাদের মাঝে ঘুরে ফিরে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী লাখাে শহিদের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে যায় । প্রিয় মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষার মহান ইতিহাসের স্মরণে প্রতিবছর বিজয় দিবস অত্যন্ত জাকজমকপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে পালিত হয়ে আসছে । তবে দিবসটি শুধু পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর তাৎপর্য অনুধাবন ও জাতি হিসেবে আমাদের করণীয় ঠিক করতে পারলেই বিজয়ের আনন্দ পূর্ণতা পাবে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *