লীগ অব নেশনস কাকে বলে ? এর পটভূমি, গঠন, উদ্দেশ্য এবং বিলুপ্তির কারণ

আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা লীগ অব নেশনস কাকে বলে (What is League of Nations in Bengali)? লীগ অব নেশনস এর পটভূমি, প্রধান এবং ব্যর্থতার কারণ, লীগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কোনটি এবং এর প্রধান উদ্যোক্তা কে? এসব বিষয়ে জানবো।

লীগ অব নেশনস কাকে বলে

Table of Contents

লীগ অব নেশনস কাকে বলে ? (What is League of Nations)

গত শতকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) সংগঠিত হয়। মূলত জাতিগত দন্দ্ব নিরসনে মধ্যস্ততাকারী শান্তিকামী জনতা যুদ্ধের ধংসলীলায় চুপ করে থাকেনি।

এরই পরিপেক্ষিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ সালের ১০ই জানুয়ারি বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লীগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠিত হয়।

সতরাং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯২০ সালের ১০ই জানুয়ারি যে সংঘটন প্রতিষ্ঠিত হয় তাকে লীগ অব নেশনস বলে।

কিন্তু লীগ অব নেশনস এর সাংগঠনিক দুর্বলতা অ অন্যান্য কারণে বিশ্বশান্তি বিধানে তা ব্যর্থ হয়।

লীগ অব নেশনস এর পটভূমি

ইউরোপের ইতিহাসে দেখা যায়, প্রতিটি বড় ধরনের যুদ্ধের পর বিজয়ী পক্ষ যে বিধিব্যবস্থা গ্রহণ করে তার স্থিতাবস্থার জন্য এক ধরনের সাংগঠনিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

এর লক্ষ্য, যাতে পরবর্তীতে কেউ শান্তি বিনষ্ট করতে সক্ষম না হয়। নেপোলিয়নিক যুদ্ধের পর ১৮১৫ সালের ভিয়েনা সম্মেলনের মাধ্যমে এরূপ একটি শক্তি সমবায় গঠন করা হয়েছিল। ফলে তখন থেকে ১৮৭০ সাল পর্যন্ত ইউরোপে শান্তি বিরাজ করে।

আবার ১৮৭১ সালে ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়া যুদ্ধের পর ত্রি-সম্রাট লীগ গঠনের মাধ্যমে এক ধরনের স্থিতাবস্থা আনার চেষ্টা করা হয়। এর ফলে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপ বড় ধরনের কোনো যুদ্ধবিগ্রহের মুখোমুখি হয়নি (বলকান অঞ্চলের সমস্যা ছাড়া)।

এদিক দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বাস্তবতা ছিল একেবারেই ভিন্নরকম। কেননা এ যুদ্ধের বীভৎসতা, মানব বিপর্যয় ও সম্পদহানি পূর্বেকার সকল রেকর্ডকে ম্লান করে দিয়েছিল। এ যুদ্ধে ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্রের ব্যবহার বিশ্বের চিন্তাশীল মানুষকে স্তম্ভিত করে দেয়।

ভবিষ্যতে এরূপ যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যেতে পারে।

এ আশঙ্কা থেকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এমন এক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন, যাতে করে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে বৈশ্বিক সমস্যাবলি সমাধান করে যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে মানব সভ্যতাকে রক্ষা করা যায়।

এক্ষেত্রে যুদ্ধকালীন সময়ে দুটো বড় উদ্যোগের চেষ্টা চলে। ১৯১৭ সালে পোপ পঞ্চদশ বেনেডিক্ট আর যুদ্ধ না করে আপস ও আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধ মেটানোর আহ্বান করেন।

ব্রিটেনের জেনারেল স্মার্টস ফিলিমোর আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে আপসে বিরোধ মেটাবার জন্য প্রস্তাব দেন।

এক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়। উইলসন তার প্রস্তাবের চতুর্দশ দফায় বলেছিলেন যে, সব জাতির প্রতি ন্যায়বিচার এবং সব জাতির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়তে হবে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্যারিস শান্তি সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট উইলসনের শান্তি প্রস্তাব উত্থাপিত হলে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বা লীগের গঠনতন্ত্র রচনার জন্য ১৯ সদস্যের একটি কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। উইলসন ছিলেন এ কমিটির সভাপতি।

এ কমিটি জাতিসমূহের একটি লীগ অব নেশনস  গঠনের জন্য একটি খসড়া গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করে। এ খসড়ার নাম ছিল লীগ কভেন্যান্ট।

প্যারিসের সম্মেলনে কতিপয় বাদ প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে এ খসড়াটি অনুমোদিত হয়। এরপর ভার্সাই সন্ধির প্রথম খণ্ডে এ খসড়াটি গৃহীত হলে লীগ অব নেশনস বা জাতিসংঘ গঠিত হয়।

লীগ অব নেশনস গঠনের উদ্দেশ্য (Aims of the Formation of the League of Nations)

লীগ অব নেশনস গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সীমানা অক্ষুণ্ণ রাখা, একে অপরকে আক্রমণ করতে নিরুৎসাহিত করা এবং কোনো সদস্য রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্র কর্তৃক আক্রান্ত হলে সমবেতভাবে আক্রান্ত রাষ্ট্রকে সহায়তা করা, সংখ্যালঘু সমস্যা, ম্যান্ডেট ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা এ লীগ গঠনের উদ্দেশ্য ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উইলসন মানবতাবাদী ও আদর্শবাদী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তার ১৪ দফায় যেসব বিষয় উল্লেখ করেন তা বাস্তবায়ন করার জন্যই মূলত লীগ অব নেশনস গঠিত হলেও এর গঠনশৈলী ও কতিপয় ধারা উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

উইলসনের ১৪ দফার চতুর্দশতম ধারা অনুযায়ী সব জাতির প্রতি সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হলে জাপান সব জাতির সমান অধিকারের শর্তটি গঠনতন্ত্রে সংযোজন করতে দাবি জানালে ব্রিটেনের বিরোধিতায় তা গৃহীত হয়নি কারণ এ ধারাটি সংযোজিত হলে ব্রিটেনের উপনিবেশগুলো হারাবার ভয় ছিল ।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, লীগ অব নেশনস গঠনের পূর্বে যে উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছিল, লীগের গঠনতন্ত্রে তা প্রতিফলিত হয়নি ।

লীগ অব নেশনসের ১০-১৬ ধারায় আন্তর্জাতিক শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। ১০ নং ধারার চুক্তিতে বলা হয়, লীগের সদস্যদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা লীগ অব নেশনস রক্ষা করবে।

অর্থাৎ কোনো রাষ্ট্র লীগের কোনো সদস্যকে আক্রমণ করলে লীগ অব নেশনস  সেই সদস্য রাষ্ট্রের স্বাধীনতা রক্ষায় বলপ্রয়োগ করবে।

১১ নং ধারায় যৌথ নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করা হয়। ১২ নং ধারায় বলা হয়, যদি কোনো বিরোধের কারণে আন্তর্জাতিক শান্তি বিনষ্টের সম্ভাবনা থাকে তাহলে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে তা মীমাংসা করা হবে।

১৬ নং ধারাটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এ ধারায় বলা হয় যে, যদি কোনো সদস্য ১২, ১৩, ও ১৫ নং ধারা লঙ্ঘন করে যুদ্ধ আরম্ভ করে তবে তাকে আক্রমণকারী ঘোষণা করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে অপর সদস্যরা অর্থনৈতিক অবরোধ করতে বাধ্য থাকবে।

অপরাধী রাষ্ট্রকে সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা যাবে এবং প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।

লীগ অব নেশনস এর গঠন (Structure of League of Nations)

লীগ অব নেশনস-এর দুটি শক্তিশালী অঙ্গ ছিল। একটি কাউন্সিল এবং অপরটি সাধারণ পরিষদ বা General Assembly।

বিশ্বের শক্তিধর ৫টি রাষ্ট্র যেমন – ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি ও জাপান এই কাউন্সিলের স্থায়ী সদস্য মনোনীত হয়। এছাড়া পরিষদে ৪টি অস্থায়ী সদস্যপদ সৃষ্টি করা হয়।

কংগ্রেস অনুমোদন না করায় শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এ কাউন্সিলে যোগদান করতে পারেনি। ফলে ৪টি স্থায়ী সদস্য নিয়ে লীগ অব নেশনস-এর কাউন্সিল গঠিত হয়। এ কাউন্সিলের এখতিয়ারের মধ্যে ছিল-

  1. লীগের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করা।
  2. সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক কোনো বিরোধ দেখা দিলে আলোচনার মাধ্যমে তা মীমাংসা করা।
  3. আন্তর্জাতিক নিরস্ত্রীকরণের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।
  4. সংখ্যালঘু সমস্যা সমাধানে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
  5. ম্যান্ডেট সংক্রান্ত বিষয়াবলিতে সমাধান দেওয়া।
  6. লীগ অব নেশনস-এর সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া ইত্যাদি।

এ কাউন্সিলে কোনো মীমাংসার সূত্র বের করার জন্য সব সদস্যের একমত হওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। একমাত্র প্রথাগত কোনো বিষয় ছাড়া অপর সব বিষয়ে পরিষদকে সর্বসম্মত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হতো।

লীগের অপর অঙ্গ ছিল সাধারণ পরিষদ বা লীগ অ্যাসেম্বলি। এ অ্যাসেম্বলিতে সব সদস্য রাষ্ট্র অংশগ্রহণ করতে পারত। বছরে অন্তত একবার এ অ্যাসেম্বলি অধিবেশনে মিলিত হতে পারত।

তবে জরুরি অবস্থায় সাধারণ সভা জরুরি বৈঠকে মিলিত হতে পারত। লীগের সাধারণ সভার আলোচ্যসূচি নির্ধারণ করতেন লীগের মহাসচিব। সাধারণ সভায় প্রতিটি সদস্যের একটি করে ভোট ছিল।

সাধারণ সভা যেকোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করে প্রস্তাব বা পরামর্শ দিতে পারত। এ সভা দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতিতে নতুন সদস্য গ্রহণ করতে পারত।

বার্ষিক বাজেট পেশ, আন্তর্জাতিক বিরোধ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় সাধারণ সভাতেই উত্থাপন ও অনুমোদন করা হতো।সব স্বাধীন রাষ্ট্র, স্বায়ত্তশাসিত, ডোমিনিয়ন-এর স্ট্যাটাসপ্রাপ্ত এবং ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত রাষ্ট্রগুলো লীগ অব নেশনস -এর সাধারণ পরিষদের সদস্যপদ গ্রহণ করতে পারত।

তবে এ পরিষদ শুধুমাত্র প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারত, কোনো প্রস্তাব বাস্তবায়নের বা ক্ষমতা এ পরিষদের ছিল না। সব ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা ছিল কাউন্সিলের হাতে।

লীগ অব নেশনস-এর কার্যাবলি পরিচালনার জন্য একটি সচিবালয় ছিল। সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ছিল এর অফিস।

এখানে সেক্রেটারি জেনারেল বা মহাসচিবের নির্দেশে কর্মকর্তারা কাজ করতেন। এ সচিবালয়ের কাজ ছিল কাউন্সিল ও সাধারণ পরিষদের সভার কার্যতালিকা রচনা করা; পরিষদ ও সাধারণ সভার নির্দেশকে কার্যে রূপান্তরিত করা ইত্যাদি।

লীগ অব নেশনসের অধীনে আরও দুটি দপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয় আন্তর্জাতিক আদালত ও আন্তর্জাতিক শ্রম দপ্তর। আন্তর্জতিক আদালত সব ধরনের আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত।

বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে লীগ অব নেশনস এর গুরুত্ব (Significance of the League of Nations in the Universal Political Context)

লীগ অব নেশনস গঠিত হওয়ার পরবর্তী এক দশক এটি একটি সফল আন্তর্জাতিক সংস্থার মর্যাদা লাভ করে। এ সময়টিকে লীগে অব নেশনসের সুবর্ণ যুগ বলা হয়।

এ সময়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক কোনো স্বার্থ ঘটিত দ্বন্দ্ব প্রকটিত না হওয়ায় লীগ অব নেশনসের পক্ষে আর্ন্তজাতিক বিরোধগুলোর নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়।

ফলে এটি একটি কার্যকর সংগঠন বলে প্রতিপন্ন হয়। এ সময়ের মধ্যে লীগ অব নেশনস নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলো সমাধান করতে সমর্থ হয় ।

এলান্ড দ্বীপপুঞ্জ সংক্রান্ত বিরোধ (Conflict Regarding the Aland Islands):

বাল্টিক সমুদ্রের এলান্ড দ্বীপপুঞ্জ ছিল ফিনল্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এর অধিবাসীরা জাতিগতভাবে সুইডেনের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় তারা সুইডেনের সাথে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। সুইডেনও এ দ্বীপের ওপর তার অধিকার দাবি করে।

ফলে বাল্টিক অঞ্চলে গোলযোগের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। তখন সুইডেন ও ফিনল্যান্ড কেউই লীগ অব নেশনস-এর সদস্য না থাকায় এ সমস্যায় হস্তক্ষেপ করার ক্ষেত্রে লীগ অব নেশনসের আইনগত অধিকার ছিল না।

ব্রিটেনের প্রস্তাবে জাতিসংঘ এ সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করে অনুসন্ধানের দায়িত্ব প্রদান করে। এ কমিটির রিপোর্ট অনুসারে এলান্ড দ্বীপপুঞ্জ ফিনল্যান্ডের অধীনে রাখা হয়।

তবে এ দ্বীপের অধিবাসীদের জাতিগত স্বকীয়তা, সংস্কৃতি, জীবন ও সম্পদ সুরক্ষার জন্য একে নিরপেক্ষ অঞ্চল বলে ঘোষণা করে ফিনল্যান্ডকে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয় ।

সাইলেশিয়া সংকট সমাধান (Solution of Silesian Crisis):

সাইলেশিয়া প্রদেশের কিছু অংশ নিয়ে পোল্যান্ড ও জার্মানির মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে লীগ অব নেশনস উভয় দেশের সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। উভয় দেশ তা মেনে নেয়

তুরস্ক ও ইরাকের মধ্যকার সীমানা বিরোধ (Turky-Iraq Border Conflict):

তুরস্ক ও ইরাকের সীমানা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য লীগ অব নেশনস একটি সীমানা কমিশন গঠন করে দেয়।

কিন্তু কুর্দি জাতির বিদ্রোহে সীমানা কমিশনের কার্যক্রম ব্যাহত হলে তুরস্ক কুর্দিদের ওপর ভয়ানক অত্যাচার-উৎপীড়ন চালায়।

এতে তুর্কি-ইরাক যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠলে লীগ অব নেশনস মধ্যস্থতা করে উভয়পক্ষকে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করতে সমর্থ হয়।

করফু সংকট (Corfu Crisis):

গ্রিস ও আলবেনিয়ার সীমান্ত জরিপ কাজে নিযুক্ত জনৈক ইতালীয় কর্মচারীকে গ্রিসে হত্যা করা হলে ইতালির একনায়ক মুসোলিনী লীগ অব নেশনসের তোয়াক্কা না করেই ১৯২৩ সালে নৌবহর পাঠিয়ে গ্রিসের করফু দ্বীপে গোলাবর্ষণ করে তা দখল করে নেয়।

ইতালি অতঃপর গ্রিসের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা ও ক্ষতিপূরণ দাবি করে। গ্রিস বিষয়টি লীগ অব নেশনস কাউন্সিলে উত্থাপন করে। কাউন্সিলে এ সংক্রান্ত বিতর্ক চলার সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতরা পৃথকভাবে প্যারিসে মিলিত হয়ে বিষয়টি মীমাংসা করতে সমর্থ হন। গ্রিস ক্ষমাপ্রার্থনা ও ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হলে সমস্যাটি মিটে যায়।

গ্রিস-বুলগেরিয়া বিরোধ (Greece Bulgaria Conflict):

গ্রিস ও বুলগেরিয়ার মধ্যে সীমান্তে বহু জটিল সমস্যা ছিল। ১৯২৫ সালে গ্রিস-বুলগেরিয়া সীমান্তে দুই জন গ্রিক সৈন্য নিহত হলে গ্রিস করফুর ঘটনার কথা স্মরণে রেখে বুলগেরিয়ার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা ও ক্ষতিপূরণ দাবি করে।

বুলগেরিয়া তদন্তের প্রস্তাব দিলে গ্রিস তা অগ্রাহ্য করে সৈন্য পাঠায়। এতে গ্রিস-বুলগেরিয়া সংঘর্ষ শুরু হয়। বুলগেরিয়া লীগ অব নেশনস কাউন্সিলে অভিযোগ উত্থাপন করলে কাউন্সিল গ্রিক সেনাদের বুলগেরিয়া থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য করে।

এছাড়া গ্রিসের ক্ষমাপ্রার্থনা ও ক্ষতিপূরণ দাবি নাকচ করে দেয়। অধিকন্তু গ্রিসকে আক্রমণকারী আখ্যা দিয়ে বুলগেরিয়াকে ক্ষতিপূরণ স্বরূপ ৪২ হাজার পাউন্ড প্রদান করতে নির্দেশ দেয় ।

এভাবে গ্রিস-বুলগেরিয়া সংকটের নিষ্পত্তি ঘটে। লক্ষণীয় যে, করফু ঘটনার সময় লীগ অব নেশনস ইতালিকে আক্রমণকারী ঘোষণা দিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

গ্রিস দুর্বল, তাই তার ওপর ব্যবস্থা নেওয়ায় লীগের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।

পোল্যান্ড-লিথুয়ানিয়া সংকট (Problem between Poland and Lithuania):

এককালে ‘ভিলনা’ লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ছিল। ১৯০২ সালে পোল্যান্ড স্থানটি দখল করে। কিন্তু লিথুয়ানিয়া স্থানটির বৈধতার দাবি উত্থাপন করলে পোল্যান্ড-লিথুয়ানিয়া বিরোধ শুরু হয়।

১৯২২ সালে লীগ অব নেশনস এ সংকট সমাধানের জন্য গণভোটের আয়োজন করে। এতে ‘ভিলনা’ পোল্যান্ডের সাথে যুক্ত হওয়ার মত দিলে লীগ অব নেশনস লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ডের সীমানা স্থির করে দেয়। ভিলনা পোল্যান্ডের অধিকারেই থেকে যায় ।

লীগ অব নেশনস এর ব্যর্থতার কারণ

১৯৩০ সাল পর্যন্ত লীগ অব নেশনস অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিরোধ মোটামুটি সাফল্যের সাথে মোকাবিলা করে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় সমর্থ হয়।

কিন্তু ১৯৩১ এর পর বৃহৎ শক্তিগুলো পারস্পরিক স্বার্থে দ্বিধাবিভক্ত হলে লীগ অব নেশনস তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে।

যেমন: জাপান ১৯৩১ সালে চীন আক্রমণ করে মাঞ্চুরিয়া দখল করে নেয়। জাপান ছিল লীগ অব নেশনসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং চীন নবীন সদস্য।

চীন লীগ অব নেশনসের কাছে ন্যায়বিচার দাবি করে আবেদন করলে ব্রিটেনের প্রভাবে লীগ অব নেশনস জাপানের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।

কিন্তু বিশ্ব জনমতের চাপে ও চীনা জাতীয়তাবাদীদের প্রচন্ড গোলমালের কারণে লীগ অব নেশনস এ সংক্রান্ত এক কমিশন গঠন করে। এদিকে জাপান মাঞ্চুরিয়ায় মাঞ্জুকুয়ো নামে এক তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করে তার সব দায়-দায়িত্ব অস্বীকার করে।

কমিশন জাপানকে আক্রমণকারী সাবস্ত করলে এর প্রতিবাদে দেশটি লীগ অব নেশনসের সদস্যপদ পরিত্যাগ করে। কিন্তু ব্রিটেনের প্রভাবে লীগ অব নেশনস জাপানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়।

১৯৩৫ সালে ইতালি আবিসিনীয় সীমান্তে ওয়াল ওয়ালা গ্রামে গুলিবর্ষণ করলে আবিসিনিয়া লীগ অব নেশনস কাউন্সিলে আবেদন জানায়। লীগ অব নেশনস ঘটনা তদন্তে কমিশন গঠন করে, তবে তা ব্রিটেন ও ফ্রান্সের চাপে অকার্যকর করে রাখা হয়।

ইতোমধ্যে ইতালি আবিসিনিয়া সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করলে লীগ অব নেশনস একের পর এক কমিশন গঠন করলেও ব্রিটেনের চাপে সে কমিটিগুলোর রিপোর্ট বাতিল হয়ে যায়।

ব্রিটেন ও ফ্রান্স ভেবেছিল ইতালির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ফ্যাসিবাদী ইতালি নাৎসিবাদী জার্মানির সাথে ঐক্যবদ্ধ হলে ইউরোপের শক্তির ভারসাম্য বিনষ্ট হবে এবং তা ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এজন্য তারা ইতালিকে লীগ অব নেশনসের মাধ্যমে শাস্তি দিতে অনীহা প্রকাশ করে।

শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন ও ফ্রান্স তাদের নিজ দেশের জনমতের চাপে ইতালিকে আক্রমণকারী ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় এবং লীগ অব নেশনস গঠনতন্ত্রের ১৬ নং ধারা অনুযায়ী ইতালির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করে।

কিন্তু ইতালি লীগ অব নেশনসের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে সদস্যপদ পরিত্যাগ করে। এভাবে ১৯৩১ সালের পর বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের স্বার্থে লীগ অব নেশনস কে অমান্য করতে শুরু করলে এর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়।

লীগ অব নেশনস এর কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে গেলে যৌথ নিরাপত্তা বিনষ্ট হয়। এর ফলে বিশ্ব আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়। রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে লীগ অব নেশনস ব্যর্থ হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে এটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সমর্থ হয়।

লীগ অব নেশনসের ২৩ নং ধারা অনুযায়ী ১৯২৩ সালে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা গঠিত হলে প্রাচ্যদেশে কলেরা, প্লেগ ও ম্যালেরিয়া দমনে এটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সমর্থ হয়।

১৯২০ সালে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে লীগ অব নেশনসের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাধা দূর করার জন্য বহুবিধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

এছাড়া আন্তর্জাতিক স্বার্থ নির্ধারণ, শ্রমিক স্বার্থ সংরক্ষণ, সঙ্গতিপূর্ণ আমদানি শুল্ক, দাস বাণিজ্য বিলোপ সাধন, মূলধন ও পণ্য চলাচলে বাধা দূরীকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে  অসংখ্য কার্যকর সুপারিশ প্রণয়ন করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের পুনর্গঠনে লীগ অব নেশনস উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। যদিও রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসায় লীগ অব নেশনস তেমন সফল হয়নি, তবে এর অর্জনও কম নয়।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে লীগ অব নেশনসের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ এর সাধারণ পরিষদের হাতে কোনো ক্ষমতা ছিল না। আর কাউন্সিল ছিল বৃহৎ শক্তিবর্গের নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে লীগ অব নেশনস বৃহৎ শক্তিবর্গের ক্রীড়নকে পরিণত হয়।

লীগ অব নেশনস কাকে বলে? লীগ অব নেশনস এর পটভূমি, গঠন, উদ্দেশ্য, গুরুত্ব এবং ব্যর্থতার কারণ আশা করি এই আর্টিকেলের মাধ্যমে আপনারা জানতে পেরেছেন।

উড্রো উইলসন

প্রশ্ন ১. লীগ অব নেশনস কত সালে গঠিত হয় ?

উত্তর: ১৯২০ সালের ১০ই জানুয়ারি।

(প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। ১৯২০ সালের ১০ই জানুয়ারি প্যারিস শান্তি আলোচনার ফলস্বরূপ লীগ অব নেশনস সংস্থাটির জন্ম।

প্রশ্ন ২. লীগ অব নেশনস কোন সালে বিলুপ্ত হয়?

উত্তর: ১৯৪৬ সালে।

(লীগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২০ সালে। এ সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন প্রদত্ত ১৪ দফার শেষ দফায়। জাতিপুঞ্জ বা লীগ অব নেশনসের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে ২০ এপ্রিল ১৯৪৬)

প্রশ্ন ৩. লীগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা কে?

উত্তর: উড্রো উইলসন।

প্রশ্ন ৪. লীগ অব নেশনস গঠনের উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: লীগ অব নেশনসের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা ।

প্রশ্ন ৫. লীগ অব নেশনস কাকে বলে?

উত্তর: ১৯১৪ সাল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে স্থায়ী  শান্তি প্রতিষ্ঠার করার জন্য ১৯২০ সালের ১০ই জানুয়ারি যে সংঘটন প্রতিষ্ঠা করা হয় তাকে লীগ অব নেশনস বলে।

প্রশ্ন ৬. লীগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা কে?

উত্তর: উড্রো উইলসন।

প্রশ্ন ৭. লীগ অব নেশনস এর সদর দপ্তর কোথায় স্থাপিত হয়েছিল?

উত্তর: লীগ অব নেশনস এর সদর দপ্তর স্থাপিত হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ।

প্রশ্ন ৮. লীগ অব নেশনসের কয়টি শক্তিশালী অঙ্গ ছিল?

উত্তর: লীগ অব নেশনসের দুটি শক্তিশালী অঙ্গ ছিল।

প্রশ্ন -৯. লীগ অব নেশনস এর প্রচলিত ভাষা কি ছিল?

উত্তর :ফরাসি ও ইংরেজি

About Author

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *